ধানমন্ডির কলাবাগানের ছোট্ট এক গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে মাশা আল্লাহ জেনারেল স্টোর। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের আনাগোনা লেগেই থাকে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজনের প্রায় সবকিছুই মেলে এই দোকানে।

তাকভর্তি পণ্য, গোছানো হিসাব আর দোকানের মালিকের মুখে একরাশ তৃপ্তির হাসি, সব মিলিয়ে দোকানটি এখন এলাকার মানুষের ভরসার জায়গা।

প্রিয়শপের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকে দোকানে ক্রেতাদের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬৫%। মাসিক হিসাবে দোকানটির ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ আগে যেখানে ছিল প্রায় ২,৭৩০, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪,৫০০-তে।

একই সঙ্গে দোকানে SKU-র সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে প্রায় ৩৫০টি SKU রাখা হতো, এখন তা বেড়ে প্রায় ৫০০টিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ SKU বেড়েছে প্রায় ৪৩%। 

নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই, ডিজিটাল অর্ডারিং, ক্রেডিট সুবিধা আর ChutneyAds এর মাধ্যমে বাড়তি আয়ের সুযোগ, সব মিলিয়ে দোকানটির সামগ্রিক লাভ বেড়েছে প্রায় ২০%।

তবে দোকানের এই অবস্থান রাতারাতি তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে অনেক পরিশ্রম, অনিশ্চয়তা এবং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর এক সংগ্রামী গল্প।

প্রবাসে পাড়ি জমানোর সেই দিনগুলো

মানুষ যখন বিদেশে পাড়ি জমায়, তখন মনের ভেতর একটাই চিন্তা কাজ করে, পরিবারের জন্য কিছু একটা করতে হবে, সংসারে একটু সচ্ছলতা আনতে হবে।

আমাদের আজকের গল্পের মানুষটিও একই স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন।

প্রবাসে পা রাখার পর প্রথম দিকটা ছিল সবচেয়ে কঠিন সময়। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, নতুন কাজের ধরন, সব মিলিয়ে মানিয়ে নেওয়াটাই ছিল এক ধরনের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধ তিনি লড়েছেন, দিনের পর দিন পরিশ্রম করেছেন।

কিন্তু যে সম্ভাবনা নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন, বাস্তবতা ছিল তার চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন। যা আয় হতো, তা দিয়ে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি দেশে পরিবারের জন্য টাকা পাঠানোই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

বছরের পর বছর পরিশ্রম করেও যে স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন, সেটি যেন ক্রমেই আরও দূরে সরে যাচ্ছিল।

শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালে সব হিসাব মিলিয়ে দেখলেন, এভাবে আর সামনে এগোনো সম্ভব নয়। ভাঙা স্বপ্ন আর একরাশ হতাশা নিয়ে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

দেশে ফিরে নতুন লড়াই

দেশে ফিরে সামান্য যা সঞ্চয় ছিল সেটিকেই পুঁজি করে শুরু করেন মাশা আল্লাহ জেনারেল স্টোর।

শুরুর দিকে দোকানে পণ্য ছিল সীমিত, বিক্রিও ছিল স্বল্প পরিসরে। বর্তমানে তার দোকানে মাসিক প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মতো বিক্রি হচ্ছে।

ক্রেতা এলেও প্রয়োজনীয় সব পণ্য সবসময় দোকানে পাওয়া যেত না। কোনো পণ্য শেষ হয়ে গেলে নতুন করে সংগ্রহ করতে সময় লেগে যেত, আবার ক্রেতার পছন্দের ব্র্যান্ড না থাকায় অনেক সময় বিক্রির সুযোগও হাতছাড়া হয়ে যেত।

দোকানে তখন প্রায় ৩৫০টি পণ্যের ধরন রাখা যেত। সীমিত পুঁজি আর অনিয়মিত সাপ্লাইয়ের কারণে এর বেশি পণ্য তোলার সুযোগ খুব একটা মিলত না।

এই সমস্যাগুলো শুধু তার একার ছিল না। দেশের অধিকাংশ ছোট মুদি দোকানিকেই সীমিত পুঁজি, অনিয়মিত সাপ্লাই, প্রয়োজনীয় মজুদের ঘাটতি এবং লাভ-ক্ষতির হিসাব পরিচালনার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। তিনিও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না।

এর মধ্যেই শুরু হয় করোনা মহামারি। লকডাউনে দোকানপাট বন্ধ, মানুষের হাতে অর্থের সংকট এবং পণ্য সংগ্রহের অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাটাই তখন সবচেয়ে বড় লড়াই হয়ে দাঁড়ায়।

তবু তিনি থেমে থাকেননি। ধৈর্য ধরে সেই কঠিন সময় পার করেছেন।

প্রিয়শপের সঙ্গে নতুন অধ্যায়

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে দোকানের চেহারাও। কঠোর পরিশ্রম আর ব্যবসার সঙ্গে লেগে থাকার ফলে ছোট্ট দোকানটি ধীরে ধীরে বড় পরিসরের একটি ব্যবসায় রূপ নিতে শুরু করে।

এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে প্রিয়শপের নিয়মিত পণ্য সরবরাহ, ডিজিটাল অর্ডারিং, ডোরস্টেপ ডেলিভারি এবং ক্রেডিট সুবিধা। আগে সীমিত কিছু পণ্য ও ব্র্যান্ডের ওপর নির্ভর করে দোকান চালাতে হতো, প্রিয়শপের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর এখন বিভিন্ন পরিচিত ও নামী ব্র্যান্ডের পণ্য সহজেই দোকানে তুলতে পারছেন তিনি।

এখন ক্রেতা যে ব্র্যান্ড বা পণ্য খুঁজছেন, সেটি দোকানে পাওয়ার সম্ভাবনা আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে পণ্য না পেয়ে ক্রেতা ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি কমেছে এবং দোকানের ওপর ক্রেতাদের আস্থা আরও বৃদ্ধি হয়েছে।

অর্ডার এখন আরও সহজ

অর্ডার করাটাও এখন আর আগের মতো ঝামেলার নয়। প্রিয়শপের অ্যাপের মাধ্যমে দোকানে বসেই প্রয়োজনীয় পণ্যের অর্ডার দিতে পারেন তিনি। সেই অর্ডার সময়মতো দোকানে পৌঁছেও যায়।

আগে পণ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন বাজার বা ডিলারের কাছে ছুটে যেতে হতো। সেই সময় ও শ্রম এখন তিনি ব্যবসার অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করতে পারছেন, যেমন:

ফলে আগের তুলনায় অনেক বেশি গোছানো এবং কার্যকর উপায়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন তিনি।

ক্রেতা বৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছে লাভ

দোকানে বেশি পণ্য, বেশি ব্র্যান্ডের অপশন এবং নিয়মিত সরবরাহ থাকার কারণে মাশা আল্লাহ জেনারেল স্টোর এখন আরও বেশি সংখ্যক ক্রেতার চাহিদা পূরণ করতে পারছে।

এই লাভ বৃদ্ধির পেছনে কাজ করেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়মিত মজুদে রাখা, ক্রেতার পছন্দ অনুযায়ী বেশি ব্র্যান্ডের অপশন দেওয়া, পণ্য না থাকার কারণে হারানো বিক্রি কমানো, পণ্য সংগ্রহের সময় ও যাতায়াত খরচ কমানো এবং ক্রেডিট সুবিধার মাধ্যমে হাতে টাকা ধরে রাখা, সবকিছুই তার ব্যবসাকে আরও লাভজনক করেছে।

আগে যেখানে সীমিত পণ্যের কারণে অনেক ক্রেতাকে ফিরিয়ে দিতে হতো, সেখানে এখন প্রায় ৫০০টি SKU থাকার কারণে আরও বেশি প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ প্রিয়শপ শুধু দোকানের বিক্রি বাড়াতে সাহায্য করেনি, বরং ব্যবসার পরিচালনাকেও আরও সহজ ও লাভজনক করেছে।

ক্রেডিট সুবিধা: কঠিন সময়ে ব্যবসার ভরসা

নিয়মিত লেনদেন এবং সময়মতো অর্ডার সম্পন্ন করার কারণে তিনি ধীরে ধীরে প্রিয়শপের একজন বিশ্বস্ত রিটেইলার হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

বর্তমানে প্রায় ১২,০০০ রিটেইলার প্রিয়শপ থেকে ক্রেডিট সুবিধা পাচ্ছেন। মাশা আল্লাহ জেনারেল স্টোরের মালিকও তাদের একজন।

আগে হাতে পর্যাপ্ত নগদ টাকা না থাকলে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা পিছিয়ে দিতে হতো। এতে অনেক সময় বেশি চাহিদার পণ্য মজুদে রাখা সম্ভব হতো না এবং ক্রেতা ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতো।

ক্রেডিট সুবিধা পাওয়ার পর এখন হাতে নগদ টাকার সাময়িক ঘাটতি থাকলেও তিনি প্রয়োজনীয় পণ্য তুলতে পারছেন। বেশি চাহিদার পণ্য নিয়মিত মজুদে রাখতে পারছেন এবং ঈদ বা অন্য কোনো উৎসবের আগে বাড়তি পণ্য প্রস্তুত রাখতে পারছেন। পাশাপাশি ব্যবসায় হাতে টাকার জোগান আরও ভালো থাকছে এবং বিক্রির সুযোগ হারানোর ঝুঁকি কমেছে।

এই ক্রেডিট সুবিধা তার ব্যবসার মোট ২০% লাভ বৃদ্ধির পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

প্রিয়শপের মাধ্যমে বাড়তি আয়ের নতুন সুযোগ

ব্যবসা যখন ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে, তখন প্রিয়শপ তাকে শুধু পণ্য সরবরাহ ও ক্রেডিট সুবিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। ব্যবসা থেকে বাড়তি আয়ের একটি নতুন সুযোগও তৈরি করে দিয়েছে।

প্রিয়শপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ChutneyAds তার দোকানে একটি ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের স্ক্রিন বসিয়ে দিয়েছে। এই স্ক্রিনে সারাদিন বিভিন্ন পরিচিত কোম্পানি ও ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন দেখানো হয়।

দোকানের যে ফাঁকা দেয়ালটি আগে কোনো আয় এনে দিত না, সেই জায়গাটিই এখন তার জন্য বাড়তি আয়ের একটি উৎস হয়ে উঠেছে।

প্রতিদিন প্রায় ১৫০ জন ক্রেতা দোকানটিতে আসেন। সেই হিসাবে প্রতি মাসে প্রায় ৪,৫০০ বার ক্রেতারা এই স্ক্রিনের সামনে দিয়ে যাচ্ছেন।

ক্রেতারা যখন দোকানে দাঁড়িয়ে কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, ঠিক সেই সময় স্ক্রিনের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্র্যান্ড তাদের সামনে উপস্থিত হতে পারছে। এতে বিজ্ঞাপিত পণ্যের প্রতি আগ্রহ তৈরি হচ্ছে, আর দোকানের মালিক পাচ্ছেন নিয়মিত বাড়তি আয়।

মাস শেষে বিজ্ঞাপন দেখানোর বিনিময়ে পাওয়া টাকা তিনি দোকানের মজুদ বাড়ানো, দোকান চালানোর খরচ এবং পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করতে পারছেন।

ফলে ChutneyAds তার মূল ব্যবসার পাশাপাশি আয়ের একটি নতুন পথ তৈরি করে দিয়েছে।

সংখ্যায় মাশা আল্লাহ জেনারেল স্টোরের পরিবর্তন

ধরনপ্রিয়শপের আগেবর্তমান অবস্থাফলাফল
মাসিক যোগাযোগপ্রায় ২,৭৩০প্রায় ৪,৫০০৬৫% বৃদ্ধি
পণ্যের ধরনপ্রায় ৩৫০ SKUপ্রায় ৫০০ SKUপ্রায় ৪৩% বৃদ্ধি
দৈনিক বিক্রিপ্রায় ৫,০০০ টাকাআগের তুলনায় বেড়েছেব্যবসার পরিধি বেড়েছে
মোট লাভআগের লাভআগের তুলনায় বেশি২০% বৃদ্ধি
অর্ডার দেওয়ার পদ্ধতিছিল নাঅ্যাপের মাধ্যমে অর্ডারসময় ও শ্রম বাঁচছে
ক্রেডিট সুবিধাছিল নাপ্রিয়শপ ক্রেডিটব্যবসা চালাতে সহায়তা
বাড়তি আয়ছিল নাChutneyAds থেকে আয়নতুন আয়ের পথ

দেশেই মিলল সেই স্বপ্ন

সময়টা এখন আর আগের মতো নেই।

একসময় যেখানে দোকানে পণ্যের পরিমাণ ছিল সীমিত আর ক্রেতার সংখ্যাও ছিল কম, সেখানে আজ মাশা আল্লাহ জেনারেল স্টোর প্রতিদিন অনেক বেশি ক্রেতাকে সেবা দিচ্ছে। পণ্যের ধরন বেড়েছে, বিক্রি বেড়েছে, আর ব্যবসার লাভও আগের তুলনায় অনেক বেশি।

প্রিয়শপের নিয়মিত পণ্য সরবরাহ, সহজ অর্ডার ব্যবস্থা, দোকানে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা, ক্রেডিট সহায়তা এবং ChutneyAds এর মাধ্যমে বাড়তি আয়ের সুযোগ, সব মিলিয়ে তার ব্যবসাকে আরও মজবুত ও স্থিতিশীল করে তুলেছে।

একসময় যে মানুষটি স্বপ্নের খোঁজে দেশের বাইরে গিয়েছিলেন, আজ সেই মানুষটিই দেশের মাটিতে আপনজনদের সঙ্গে থেকে নিজের ব্যবসার মাধ্যমে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।

কখনো কখনো সফলতার ঠিকানা বিদেশ নয়। নিজের মানুষদের পাশে থেকে সঠিক সুযোগ, নির্ভরযোগ্য সহযোগিতা এবং কঠোর পরিশ্রমের মধ্যেই নতুন স্বপ্ন গড়ে তোলার সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে।

শুধু তিনি একা নন, তার মতো প্রায় আড়াই লাখ রিটেইলারের পাশে প্রতিদিন দাঁড়াচ্ছে প্রিয়শপ। এই যাত্রা এখানেই থেমে নেই। দেশের প্রায় ৫০ লাখ দোকানির কাছে নির্ভরযোগ্য পণ্য সরবরাহ, প্রযুক্তি, ক্রেডিট সুবিধা এবং ব্যবসা বৃদ্ধির সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই প্রিয়শপের বড় লক্ষ্য।

মাশা আল্লাহ জেনারেল স্টোরের গল্পটি তাই শুধু একজন দোকানির সাফল্যের গল্প নয়। এটি প্রমাণ করে, সঠিক সুযোগ, নির্ভরযোগ্য সহযোগিতা, ব্যবসার ক্রেডিট, প্রযুক্তি এবং নিজের পরিশ্রম থাকলে দেশের মাটিতেই নতুন করে স্বপ্ন গড়ে তোলা সম্ভব।